
আন্তঃক্যাডার দ্বন্দ্ব ও নির্বাচনী অনিশ্চয়তায় আটকে রাজস্ব সংস্কার
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) ভেঙে ‘রাজস্ব নীতি বিভাগ’ ও ‘রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগ’ নামে দুটি স্বতন্ত্র বিভাগ গঠনের প্রজ্ঞাপন জারি হয়েছিল গত বছরের ১১ মে। লক্ষ্য ছিল রাজস্ব আদায় বাড়ানো, নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মধ্যে স্বচ্ছতা আনা এবং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করা। তবে প্রজ্ঞাপন জারির প্রায় সাত মাস পার হলেও বিভাজিত দুটি বিভাগের কার্যক্রম আজও শুরু হয়নি।
বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে এই সংস্কার বাস্তবায়ন হবে কি না—তা নিয়েই তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা। প্রশাসনিক সূত্রগুলো বলছে, কর্মী কাঠামো, আন্তঃক্যাডার কর্তৃত্ব নিয়ে দ্বন্দ্ব এবং আসন্ন জাতীয় নির্বাচন মিলিয়ে এক ধরনের ‘অদৃশ্য বাধা’ সৃষ্টি হয়েছে, যা সংস্কার কার্যক্রম শুরু হওয়ার পথে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সংস্কারের লক্ষ্য, শুরুতেই আপত্তি
স্বাধীনতার ৫৪ বছর পর রাজস্ব আদায় কাঠামো সংস্কারের অংশ হিসেবে অন্তর্বর্তী সরকার এনবিআর পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেয়। এ লক্ষ্যে গঠিত সংস্কার কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী রাজস্ব নীতি প্রণয়ন ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনাকে আলাদা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
কিন্তু প্রজ্ঞাপন জারির পরপরই এনবিআরের একাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারী অংশীজনদের সঙ্গে পর্যাপ্ত আলোচনা ছাড়াই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অভিযোগ তুলে আন্দোলনে নামেন। বিশেষ করে কাস্টমস ও এক্সাইজ ক্যাডার এবং কর ক্যাডারের কর্মকর্তাদের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হয়—নতুন দুটি বিভাগ গঠিত হলে তারা প্রশাসন ক্যাডারের অধীন হয়ে পড়বেন এবং রাজস্ব সংক্রান্ত কর্তৃত্ব হারাবেন। এই আশঙ্কাই আন্দোলনের মূল কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
আন্দোলন, শাস্তি এবং অপূর্ণ সমাধান
আন্দোলনের প্রেক্ষিতে চাকরিবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে এনবিআরের তিন সদস্য ও এক কমিশনারসহ চারজনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়। পাশাপাশি অর্ধশতাধিক কর্মকর্তাকে সাময়িক বরখাস্ত ও শাস্তিমূলক বদলির মুখে পড়তে হয়। এতে আন্দোলন কিছুটা স্তিমিত হলেও এনবিআর বিভাজন ঘিরে অসন্তোষ পুরোপুরি দূর হয়নি।
রাজস্ব কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমান কাঠামোতেই প্রশাসন ক্যাডারের সঙ্গে সমন্বয়ের ক্ষেত্রে নানা ভোগান্তি রয়েছে—বিশেষ করে বৈদেশিক ছুটি, আন্তঃক্যাডার কার্যক্রম ও মাঠপর্যায়ের সমন্বয়ে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অধীনে দুটি স্বতন্ত্র বিভাগ হলে এই চাপ আরও বাড়তে পারে—এমন শঙ্কাই তাদের বিরোধিতার মূল ভিত্তি।
দ্বিতীয় কমিটি, তবুও অচলাবস্থা
এই প্রেক্ষাপটে এনবিআর চেয়ারম্যান আব্দুল রহমান খানের তত্ত্বাবধানে ও বোর্ড সদস্যের নেতৃত্বে গঠিত হয় দ্বিতীয় একটি কমিটি। কমিটি রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগের কাঠামো, জনবল এবং আন্তঃক্যাডার কর্তৃত্ব বিন্যাস নতুনভাবে নির্ধারণ করে সরকারকে সুপারিশ দেয়।
কমিটি সূত্র জানায়, সরকার চাইলে এক সপ্তাহের মধ্যেই সব আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে বিভক্ত দুটি বিভাগের কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব। তবে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পরও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি হয়নি।
নির্বাচন সামনে, সিদ্ধান্তে ধীরগতি
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে অন্তর্বর্তী সরকার নতুন করে কোনো আন্তঃক্যাডার উত্তেজনা বা প্রশাসনিক অস্থিরতা তৈরি করতে চায় না। সংশ্লিষ্ট সূত্রের মতে, এনবিআর বিভাজন কার্যকর হলে আবারও আন্দোলন বা বিরোধের আশঙ্কা রয়েছে। সে কারণেই সরকার আপাতত ‘ধীরে চলো’ নীতি গ্রহণ করেছে।
ফলে নির্বাচনের আগ পর্যন্ত পুরোনো এনবিআর কাঠামোর অধীনেই রাজস্ব আদায় ও ব্যবস্থাপনার কার্যক্রম চলবে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব থাকবে নির্বাচনের পর গঠিত সরকারের ওপর।
কেন জরুরি ছিল এনবিআর বিভাজন
রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা বিভাগের কাঠামো প্রণয়ন কমিটির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন,
“পঞ্চাশ বছরের বেশি সময় ধরে এনবিআর ধারাবাহিকভাবে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত মাত্র ৭ দশমিক ৪ শতাংশ—এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন। যেখানে বৈশ্বিক গড় ১৬ দশমিক ৬ শতাংশ। উন্নয়ন আকাঙ্ক্ষা পূরণে অন্তত ১০ শতাংশে পৌঁছানো জরুরি।”
এই লক্ষ্যেই নীতি ও বাস্তবায়নকে আলাদা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে জানান তিনি।
প্রযুক্তিনির্ভরতা ও স্বচ্ছতার প্রত্যাশা
দ্বিতীয় কমিটির সুপারিশে বলা হয়েছে, এনবিআর বিলুপ্ত করে দুটি স্বতন্ত্র বিভাগ গঠন করলে নীতি ও অপারেশন একক কর্তৃত্বের বাইরে থাকবে। এতে বিশেষ ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে সুবিধা দেওয়ার সুযোগ কমবে এবং রাজস্ব আহরণে স্বচ্ছতা বাড়বে।
একই সঙ্গে রাজস্ব আদায়ে প্রযুক্তিনির্ভরতা বাড়ানো, কর্মকর্তাদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং শারীরিক উপস্থিতিনির্ভর সেবা কমানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। মাঠপর্যায়ে সরাসরি উপস্থিতির সুযোগকে কাজে লাগিয়ে দুর্নীতি ও রাজস্ব ফাঁকির যে অভিযোগ রয়েছে, ডিজিটাল সেবার বিস্তারে তা কমবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সামনে পথ কী
কমিটির সুপারিশে আন্তঃক্যাডার সম্প্রীতি, পদোন্নতির সুযোগ, ক্যাপাসিটি বিল্ডিং ও মর্যাদার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে, যাতে কোনো ক্যাডারই বঞ্চিত বোধ না করে। তবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ও প্রশাসনিক সাহসের অভাবই এখন বড় প্রশ্ন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু প্রজ্ঞাপন জারি করলেই হবে না—কার্যকর বাস্তবায়ন ছাড়া রাজস্ব সংস্কারের সুফল মিলবে না। নির্বাচন-পরবর্তী সরকার এই সংস্কারকে কতটা অগ্রাধিকার দেয়, তার ওপরই নির্ভর করছে বাংলাদেশের রাজস্ব ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ।







