রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে অপসারণের দাবি নতুন নয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর থেকেই বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন এ দাবি জানিয়ে আসছে। তবে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণে এতদিন এ বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়নি অন্তর্বর্তী সরকার। সম্প্রতি একটি দৈনিকে দেওয়া রাষ্ট্রপতির সাক্ষাৎকার ঘিরে বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে।
প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী রাষ্ট্রপতির বক্তব্যকে ‘অভ্যন্তরীণ ও গোপনীয়’ বিষয় জনসমক্ষে প্রকাশ করে শপথ ভঙ্গ বলে দাবি করেছে। তাদের মিত্র দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) আরও একধাপ এগিয়ে রাষ্ট্রপতির অভিশংসন ও গ্রেপ্তারের প্রকাশ্য দাবি জানিয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসছে আগামী ১২ মার্চ। এ অধিবেশনেই নতুন স্পিকার নির্বাচনের কথা রয়েছে। জানা গেছে, প্রথম অধিবেশনেই রাষ্ট্রপতির অভিশংসনের প্রস্তাব উত্থাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় বিরোধী জোট।
এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব বলেন, ‘সংসদের প্রথম অধিবেশনেই রাষ্ট্রপতির অভিশংসনের প্রস্তাব উত্থাপনের ব্যাপারে ১১ দলীয় জোট ইতিবাচক। জোটের সব দল এ প্রস্তাবে সমর্থন দেবে বলে আমরা মনে করি।’
সংবিধানের ৫২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সংবিধান লঙ্ঘন বা গুরুতর অসদাচরণের অভিযোগে রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসন করা যায়। জাতীয় সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের স্বাক্ষরযুক্ত লিখিত অভিযোগ স্পিকারের কাছে জমা দিতে হয়। নোটিশ দেওয়ার ১৪ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে সংসদে তা আলোচিত হয়। এরপর সদস্য সংখ্যার অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে অভিযোগ প্রমাণিত হলে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হয়।
তবে দেশে এখন পর্যন্ত কোনো রাষ্ট্রপতির অভিশংসনের নজির নেই। ২০০১ সালে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর বিরুদ্ধে ২০০২ সালে অপসারণের উদ্যোগ নেওয়া হলেও সংসদীয় প্রক্রিয়া শুরুর আগেই তিনি পদত্যাগ করেন।
এনসিপি আহ্বায়ক ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বলেছেন, রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসনের পাশাপাশি দ্রুত গ্রেপ্তারও করা উচিত। শহীদ সেনা দিবস উপলক্ষে বনানী সামরিক কবরস্থানে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্রপতি শপথ ভঙ্গ করেছেন। জুলাই গণহত্যার সময় তিনি রাষ্ট্রের অভিভাবকের ভূমিকা পালন করেননি। তার নীরবতার দায় রয়েছে। ফলে তাকে অভিশংসন করে দ্রুততম সময়ের মধ্যে গ্রেপ্তার করা নতুন সরকারের দায়িত্ব।’
তিনি আরও বলেন, নতুন সংসদের প্রথম কাজ হওয়া উচিত রাষ্ট্রপতির অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু করা। ‘ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে আমাদের জাতীয় ঐক্য রয়েছে। সরকারি ও বিরোধী দল মিলেই এ পদক্ষেপ নেওয়া উচিত,’—যোগ করেন তিনি।
একই দাবি জানিয়েছেন এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া। তিনি বলেন, ‘সংসদের প্রথম অধিবেশনেই রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসন করতে হবে, যিনি গণহত্যার সময় নিশ্চুপ ছিলেন।’
জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ পর্যায়ের এক নেতা জানান, বিষয়টি নিয়ে দলীয় ও জোট পর্যায়ে আলোচনা চলছে। প্রাথমিকভাবে অভিশংসনের পক্ষে থাকলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
দলের আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘রাষ্ট্রপতির অভিশংসনের মতো গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক বিষয়ে হঠাৎ সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। দেশের স্বার্থ ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আমরা সিদ্ধান্ত নেব।’
সংসদের উদ্বোধনী অধিবেশনে রাষ্ট্রপতিকে ভাষণ দিতে না দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কাছে চিঠি দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার এ এস এম শাহরিয়ার কবির। চিঠিতে জুলাই বিপ্লবের চেতনা সমুন্নত রাখার স্বার্থে রাষ্ট্রপতিকে ভাষণ দেওয়া থেকে বিরত রাখার অনুরোধ করা হয়।
তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, সংবিধান অনুযায়ী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতিই ভাষণ দেবেন।
সব মিলিয়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তাপ ছড়িয়েছে। রাষ্ট্রপতির অভিশংসন প্রস্তাব আদৌ সংসদে উঠবে কি না এবং উঠলে প্রয়োজনীয় দুই-তৃতীয়াংশ সমর্থন পাবে কি না—তা এখন দেখার বিষয়।