গেল বছরের লোকসান কাটিয়ে উঠতে না উঠতেই আবারও আলুর বাজারে ধস নেমেছে জয়পুরহাটে। বাম্পার ফলন হলেও ন্যায্য দাম না পাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন জেলার আলুচাষিরা। তাদের ভাষায়, এটি যেন ‘মড়ার উপর ঘাঁড়ার ঘা’।
কৃষি বিভাগ বলছে, বাজারে আলুর সরবরাহ চাহিদার তুলনায় বেড়ে যাওয়ায় দরপতন ঘটেছে। তবে হিমাগারে আলু সংরক্ষণ শুরু হলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হতে পারে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন কর্মকর্তারা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক এ কে এম সাদিকুল ইসলাম জানান, চলতি মৌসুমে জেলায় প্রায় ৪০ হাজার হেক্টর জমিতে আলুর চাষ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় সাড়ে নয় লাখ মেট্রিক টন। ইতোমধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ আলু তোলা শেষ হয়েছে এবং আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে পুরো কাজ শেষ হবে। অনুকূল আবহাওয়া ও সঠিক পরিচর্যার কারণে বাম্পার ফলনের আশা করছে কৃষি বিভাগ।

তবে ভালো ফলনই এখন চাষিদের দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সদর উপজেলার হিচমী মোড় এলাকার বেলায়েত হোসেন, মজনু মিয়া এবং কালাই উপজেলার পুনট বাজার এলাকার সাখাওয়াত হোসেন ও মুকুল হোসেন জানান, এবার ফলন ভালো হলেও বাজারে দাম নেই।
চাষিদের তথ্য অনুযায়ী, উফশী জাতের আলু বিঘাপ্রতি ৭০ থেকে ৭৫ মণ এবং দেশি গুটি জাতের আলু ৫৫ থেকে ৬০ মণ পর্যন্ত উৎপাদন হয়েছে। কিন্তু উৎপাদন খরচ তুলনায় বিক্রয়মূল্য অনেক কম।
বেলায়েত হোসেন বলেন, “সার, বীজ, সেচ ও শ্রমিকসহ বিঘাপ্রতি খরচ হয়েছে ৩০ থেকে ৩২ হাজার টাকা। অথচ এখন বাজারে উফশী আলু প্রতিমণ ২৪০-২৫০ টাকা এবং দেশি গুটি আলু ৪০০-৪৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। লাভ তো দূরের কথা, লোকসান নিয়েই চিন্তা করতে হচ্ছে।”
চাষিদের হিসাব অনুযায়ী, উফশী আলু বিক্রি করে বিঘাপ্রতি পাওয়া যাচ্ছে ১৬ হাজার ৮০০ থেকে ১৮ হাজার ৭৫০ টাকা। আর দেশি আলু বিক্রি করে পাওয়া যাচ্ছে ২৪ হাজার ৭৫০ থেকে সর্বোচ্চ ২৭ হাজার টাকা। এতে উফশী জাতের আলুতে বিঘাপ্রতি ১৩ থেকে ১৫ হাজার টাকা এবং দেশি আলুতে ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত লোকসান গুনতে হচ্ছে।
কৃষকদের দাবি, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকারকে দ্রুত আলু রপ্তানির উদ্যোগ নিতে হবে।

অন্যদিকে পাইকারি ব্যবসায়ীরা বলছেন, বাজারে সরবরাহ বেশি হওয়ায় দরপতন স্বাভাবিক। জয়পুরহাট থেকে আলু কিনে রাজধানীর কারওয়ান বাজার, সিলেট ও চট্টগ্রামে বিক্রি করেন এমন কয়েকজন ব্যবসায়ী জানান, রমজানকে ঘিরে গৃহস্থালি চাহিদা কিছুটা কমে গেছে। ফলে তারা নিজেরাও লাভ-লোকসানের সমতায় আছেন।
জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা রতন কুমার রায় বলেন, “বাজারে সরবরাহের চাপ থাকায় দাম কমেছে। তবে অল্প দিনের মধ্যেই হিমাগারগুলোতে আলু সংরক্ষণ শুরু হলে চাষিরা ভালো দাম পাবেন বলে আশা করছি।”
তিনি আরও জানান, হিমাগারগুলোতে জায়গা সংকুলান না হলে জেলায় নির্মিত ৫২টি বিশেষ সংরক্ষণাগারে তিন থেকে চার মাস আলু রাখা যাবে। এতে বাজারে সরবরাহের চাপ কমে দাম স্থিতিশীল হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।