চাকরির নিয়োগপত্র হাতে পাওয়ার পর অনেকেই ভেবেছিলেন জীবনের অনিশ্চয়তার অধ্যায় শেষ। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা কোটায় সরকারি চাকরি পাওয়া ৯০ হাজার ৫২৭ জন এখন পড়েছেন নতুন দুশ্চিন্তায়। তাদের নিয়োগ ঘিরে চলছে বিস্তৃত যাচাই-বাছাই, যার প্রাথমিক ধাপ শেষ হলেও চূড়ান্ত পর্যায়ের কাজ এখনো চলমান। দীর্ঘ দেড় বছরেও প্রক্রিয়া শেষ না হওয়ায় চাকরি হারানোর শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন অনেকে।
কালবেলার হাতে আসা তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ৫৭টি মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর এবং তিনটি কমিশনে বিভিন্ন সময়ে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় নিয়োগ পান ৯০ হাজার ৫২৭ জন। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় তাদের পূর্ণাঙ্গ তথ্য চেয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে চিঠি পাঠালে অধিকাংশই তথ্য সরবরাহ করে। তবে যাচাইয়ে দেখা গেছে, প্রাপ্ত তথ্যের প্রায় ১০ শতাংশে ঘাটতি বা অসংগতি রয়েছে।
যাচাই-বাছাই কমিটির কর্মকর্তারা জানান, প্রথম ধাপে যাদের তথ্য অনুপস্থিত বা গরমিল পাওয়া গেছে, তাদের বিষয়ে অধিকতর যাচাই চলছে। এ পর্যন্ত প্রায় ৬৫ হাজার জনের তথ্য যাচাই সম্পন্ন হয়েছে, যা মোটের প্রায় ৬৮ শতাংশ। তবে ২০টি মন্ত্রণালয়ে ২৫৬ জনের পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যায়নি এবং ৬০ জনের তথ্যে গরমিল রয়েছে। মাত্র একটি মন্ত্রণালয়ের তথ্য সম্পূর্ণ সঠিক পাওয়া গেছে।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব মোহাম্মদ আজিজুর রহমান বলেন, ‘সর্বোচ্চ গোপনীয়তা বজায় রেখে যাচাই কার্যক্রম চলছে। প্রাথমিক ধাপ শেষ হয়েছে, এখন চূড়ান্ত যাচাই চলছে। বাকিগুলোর কাজ প্রক্রিয়াধীন।’
তথ্য অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশনে কোটায় নিয়োগ পাওয়া ৭৯ জনের মধ্যে ৫ জনের তথ্যে গরমিল রয়েছে। অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগে ৮১১ জনের মধ্যে ৪ জনের তথ্যে গরমিল এবং ৩৫ জনের তথ্য অনুপস্থিত। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ে ৩০৩ জনের মধ্যে ৮ জনের তথ্যে গরমিল ও ১৮ জনের তথ্য নেই। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে ৮১৩ জনের মধ্যে ২ জনের তথ্যে গরমিল এবং ৬৪ জনের তথ্য অনুপস্থিত।
এ ছাড়া জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ১৭২ জনের মধ্যে ৪ জনের তথ্যে গরমিল ও ৪৪ জনের পূর্ণাঙ্গ তথ্য নেই। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে ২০৭ জনের মধ্যে ৫ জনের তথ্যে গরমিল এবং ৩১ জনের তথ্য অনুপস্থিত। যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ে ১০১ জনের মধ্যে ৫ জনের তথ্যে গরমিল ও ২৩ জনের তথ্য অনুপস্থিত পাওয়া গেছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে একাধিকবার চিঠি দিয়েও এখনো পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) মাধ্যমে ক্যাডার ও নন-ক্যাডার পদে কোটায় নিয়োগ পান ৭ হাজার ৭৭৮ জন। তাদের তথ্য চাওয়া হলে পিএসসি জানায়, সংশ্লিষ্ট তথ্য তাদের কাছে নেই; বরং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংরক্ষিত। পরে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কাছেও তথ্য চাওয়া হলেও গড়িমসির অভিযোগ উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাতিলের প্রক্রিয়ায় থাকা ভুয়া মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকার নাম ব্যবহার করে কেউ চাকরি নিয়ে থাকলে তাদের নিয়োগ বাতিল হতে পারে। পাশাপাশি যেসব মুক্তিযোদ্ধার গেজেট বাতিলের প্রক্রিয়া চলছে বা বয়স সংক্রান্ত অসঙ্গতি রয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের প্রভাব সংশ্লিষ্ট চাকরিজীবীদের ওপরও পড়তে পারে।
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের ১৪ আগস্ট দায়িত্ব নিয়ে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজম সংশ্লিষ্ট তালিকা প্রস্তুত ও যাচাইয়ের নির্দেশ দেন। এরপর দুই ধাপে—প্রাথমিক ও চূড়ান্ত—যাচাই শুরু হয়। তবে ১৯ মাসে মাত্র ৬৮ শতাংশ কাজ শেষ হওয়ায় প্রক্রিয়ার ধীরগতিতে প্রশ্ন উঠেছে।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব ইসরাত চৌধুরী বলেন, ‘যাচাই-বাছাই চলমান রয়েছে। প্রাথমিক ধাপ শেষ করে এখন চূড়ান্ত পর্যায়ের কাজ এগিয়ে চলছে।’
এদিকে অনিয়ম করে কোটায় চাকরি নেওয়া বা যথাযথ কাগজপত্র জমা না দেওয়া চাকরিজীবীদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। দীর্ঘসূত্রতা ও তথ্য ঘাটতির কারণে পুরো প্রক্রিয়া কবে শেষ হবে—সে প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। অনিশ্চয়তার এই দীর্ঘ অপেক্ষায় আছেন হাজারো সরকারি কর্মচারী।